বাবুর গণিত বই

ফাতেমা আক্তার সিক্তু

এই ছেলে আমাকে ধ’রো না! বলেই এক লাফে টেবিলের অপর প্রান্তে চলে গেলো বইটি। বাবু হতভম্ব হয়ে গেল। কী ব্যাপার— এমন তো হবার কথা ছিলো না! সে তো আর অচেনা কেউ নয়। সে বাবু। চতুর্থ শ্রেণির সকল বইয়ের পরিচিত বাবু। হ্যাঁ, হতে পারে অন্য সকল বইয়ের চাইতে গণিত বইয়ের সাথে ওর সখ্য কম, তাতে কী! একেবারে অপরিচিত কেউ তো নয়।

অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর সবকিছুতে ব্যতিক্রম। সেই প্লে ক্লাস থেকে শুরু করে —নার্সারি, ওয়ান, টু, থ্রি প্রতিটি ক্লাসে বছরের শুরু থেকেই পড়ার কী ধুম! ক্লাস, কোচিং, পরীক্ষা—সব মিলিয়ে দম ফেলারও ফুরসত থাকে না। আর এবার? করোনার জন্য মার্চ থেকেই স্কুল বন্ধ। এখন জুলাই মাস, অর্থাৎ দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি চলতো এই সময়ে। কিন্তু নাহ, প্রথম সাময়িকই হলো না।

বাবুর অবশ্য স্কুল বন্ধ থাকলেই বেশি ভালো লাগে। ইচ্ছেমতো খেলা যায়, কার্টুন দেখা যায়, সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা যায়। ইদানিং আবার একটা বিড়ালছানা এসে জুটেছে। ওটাকে নিয়েও বাবুর সময় আনন্দেই কাটছে। কাজের কাজ বলতে দৈনিক কয়েক পৃষ্ঠা হাতের লেখা মায়ের কাছে জমা দিতে হয়। ছয় পৃষ্ঠা লেখার কথা থাকলেও—এখন-তখন করে করে—ঘুমের ভান ধরে। কিংবা চোখ কচলে লাল বানিয়ে মাকে দেখায়— দেখো, ঘুমে চোখ লাল হয়ে গেছে। মা কখনও রাগ করে বকাঝকা করেন, কখনও চাপা হাসিতে বলেন—যাও ঘুমাতে। বাবু অবশ্য তখনই ঘুমিয়ে পড়ে না। বলে, খিদে লেগেছে, আগে খেতে দাও। মা খাবার গরম করতে গেলে সে বসে মোবাইল নিয়ে। হয় গেম, নয়তো কার্টুন। মা খাবার নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন, ঘুম কই?

ঘুমাবো তো! আগে খাইয়ে দাও।
পাতের খাবার শেষ করতে কমপক্ষে আধঘণ্টা পার করে দেয়। তারপর আর তাকে ঘুম পাড়ায় কে!

আজ গণিত বইয়ের ব্যবহারে মনে কষ্ট পায় বাবু। সে ছোট হতে পারে, গণিতের সব নিয়ম না বুঝতে পারে—তাই বলে তাকে অপমান করার কোনো অধিকার গণিত বইয়ের নেই।

বেশ কিছুক্ষণ মন খারাপ করে বসে থাকার পর অন্য বইয়ের দিকে হাত বাড়ায় বাবু। তখনই গণিত বইয়ের সেই তীব্র প্রতিবাদ। এই ছেলে তোমাকে মানা করেছি না! এই যে তুমি তোমার আদরের মিঝু বিড়াল নিয়ে খেললে—সাবান কিংবা হ্যাণ্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে এসেছো? এখন যে কোভিড -১৯ নামের মহামারী চলছে তুমি জানো না? তুমি কি হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করো?

বাবু কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিলো, অমনি বই বলতে শুরু করে — থাক, আর বলতে হবে না। জানি, জানি। একটা হ্যাণ্ডওয়াশ আর একটা স্যানিটাইজার সেই কবে এনে বইয়ের টেবিলে রেখে দিয়েছো — নতুন নতুন দু ‘একবার ব্যবহার করেছো ঠিক, কিন্তু এখনো পুরো বোতল ভরা!

বাবু মুখভার করে আম্মু, আম্মু বলে চিৎকার করছিলো। গণিত বইয়ের ধমক খেয়ে থেমে যায় আবারও। এই ছেলে, সমস্যা কী তোমার? আম্মু, আম্মু বলে চ্যাঁচাচ্ছো কেনো?

চ্যাঁচাচ্ছি মানে? সেই কখন থেকে তুমি আমাকে বকে যাচ্ছো, ধমক দিচ্ছো। আমাকে একা পেয়ে এমন করছো, তাই না? সেজন্যই আম্মুকে ডাকছি। দেখবে, আম্মু এসে তোমার কি অবস্থা করে! প্রতিবাদী হয়ে ওঠে বাবু।

বাবুর কথা শুনে উচ্চস্বরে ভিলেনের মতো হা হা হো হো করে হাসতে থাকে গণিত বই। তারপর হাসি থামিয়ে ভেতর থেকে পঞ্চম সংখ্যাটি বের করে আনে। মুখের সামনে ঝুলিয়ে দেয় সংখ্যাটি। গণিত বই এখন আর শুধু বই নয়—সে এখন আঁকাবাঁকা পাঁচ। অর্থাৎ, মুখটা এমনভাবে বাঁকিয়ে আছে—তাকে পাঁচের মতোই লাগছে। কণ্ঠস্বরে বিজ্ঞের ভাব এনে বললো—তোমার মা কী করবে আমার? হাহ! উনি নিজেই তো আমার বাবাকে দেখে ভয়ে কাঁপতেন।
বাবু কপাল কুঁচকায়—মানে!
মানে, আমি যেমন তোমার কাছে আছি — আমার বাবা ছিলেন তোমার মায়ের কাছে। বাবার কাছেই গল্প শুনেছি — তোমার মা তাঁর গণিত বইকে সব বইয়ের নিচে রেখে দিতেন, যাতে চোখের সামনে কম পড়ে। আর কী করতেন জানো?
: না তো!
:ইচ্ছে করে হারিয়ে ফেলতেন, যাতে অংক করতে না হয়।

: তারপর?
: তারপর আর কী! যারা পেতো তারা আবার ফেরত দিয়ে দিতো। সত্যি বলতে কী—আমার বাবাকে সবাই ভয় পেতো, এখনো পায়।
: আমি ভয় পাই না ঠিক, তবে তোমাকে আমার ভালো লাগে না।
: সে আমি জানি। আর সেজন্যেই অন্যান্য বইয়ের চেয়ে আমার চেহারা তুলনামূলক ভালো এবং অক্ষত আছে।

এবারের কথাটায় ভীষণ মজা পায় বাবু। তার ঠোঁটের কোনে হাসি ঝুলে পড়ে।

গণিত বই এবার একটু সিরিয়াস ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে—আচ্ছা, তোমরা আমাদের এত ভয় পাও কেনো বলোতো?

: অন্য কারও কথা জানি না—তবে আমি তো বললামই ভয় পাই না, অপছন্দ করি।

: আচ্ছা, অপছন্দ করার কারণটাই বলো।
: অন্যান্য সাবজেক্টে যদি একটু ভুল হয়ই —ধরো, দু ‘একটা বানান ভুল হলো— তাহলে কিন্তু পুরো প্রশ্নের নাম্বার কাটা যায় না, কিন্তু, গণিতে একটা যোগ -বিয়োগ কি গুণ-ভাগ চিহ্ন ভুল হলেই পুরো অঙ্ক কাটা যায়।
: তুমি কি এটুকুও বোঝ না—যে, একটা চিহ্ন ভুল হলে পুরো অঙ্কের হিসেবে গড়মিল হয়ে যায়!
বাবু নির্বাক তাকিয়ে থাকে তার গণিত বইয়ের দিকে।
তাহলে উপায়?
: শোনো, গণিত কিংবা যে বিষয়ই হোক না কেনো—যে বিষয়টা তুমি কম বুঝবে সেটা আরও বেশি করে পড়বে। যে অঙ্ক তুমি বুঝতে পারো না সেটা বারবার করবে, প্রয়োজনে বড়দের সাহায্য নেবে। অপছন্দের বইকে দূরে সরিয়ে রাখলে সে বই আর তোমার মধ্যে কেবল দূরত্বই বাড়বে। সুতরাং …

বাবু হাত বাড়িয়ে গণিত বইকে জড়িয়ে ধরে—আর নয় দূরত্ব!

এই ছেলে, হাত ধুয়ে এসেছো তো?
বইয়ের প্রশ্নে হেসে ওঠে বাবু। হাসে বাবুর গণিত বই।