কিছু কথা কিছু ব্যথা: নূরুল করীম আকরাম

কিছু কথা কিছু ব্যথা: নূরুল করীম আকরাম
  • 299
    Shares
  • দেশ দুনিয়া নিউজ ডেস্ক:

গত দু’দিন ধরে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, আল্লামা মুহাম্মাদ মামুনুল হক দা. বা., ও আমাকে (নূরুল করীম আকরাম) জড়িয়ে অখ্যাত একটি ফেসবুক আইডির সূত্র ধরে কিছু মিথ্যা ও সত্যের অপলাপ এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বেশ কিছু অনভিপ্রেত পাল্টাপাল্টি পোস্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার প্রেক্ষিতে পক্ষ-বিপক্ষ পারস্পরিক কাঁদা ছোড়াছুড়ি ও একে অপরের চরিত্রহনন পর্যন্ত বিষয়টি গড়িয়েছে। তাই অখ্যাত ফেইক আইডি ভেবে যে কারণে বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি থেকে বিরত থাকতে চেয়েছি; তা আর সম্ভব হলোনা। আমাদের কিছু ভাইদের মাজলুমের প্রতি পুনরায় জুলুমের পরিহাস দেখেও আশ্চর্য হচ্ছি।
তাই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে কয়েকটি কথা :

এক. তথাকথিত (অখ্যাত ও ফেইক) আইডির সাথে আমার কিংবা আমার সংগঠনের দূরবর্তী কোন সম্পর্ক ছিলোনা এবং বর্তমানেও নাই আর ভবিষ্যতেও সংগঠন এমন কোন হীন কর্মে অংশ নেবেনা, ইনশাআল্লাহ। তারপরও উক্ত আইডিধারী যেহেতু আমাকে জড়িয়ে বিষয়গুলোর অবতারণা করেছে, তাই বিষয়টি খোলাসা করার প্রত্যাশা যারা করেছেন, সবার জন্য একরাশ ভালোবাসা।

দুই. উক্ত অখ্যাত ফেসবুক আইডি থেকে যে তথ্যটি দেয়া হয়েছে, তাতে আল্লামা মামুনুল হক দা. বা. -এর ব্যাপারে যতটুকু অংশ লেখা হয়েছে, তার পুরোটাই অসত্য। (এমনকি বহিষ্কারের ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। কারণ, তখন প্রতিষ্ঠানের কোন প্রশাসনিক দায়িত্বে তিনি ছিলেন না।) উক্ত বিষয়টি তাৎক্ষণিক ওস্তাদে মুহতারাম মাওলানা আবদুর রাজ্জাক দা. বা. এবং সহপাঠী Majidur Rahman ভাই খোলাসা করে দিয়েছেন পোস্ট ভাইরাল হওয়ার আগেই।

তিন. পোস্ট টি যেদিন সন্ধায় দেয়া হয়, সেদিন আমি ঢাকার বাইরে ছিলাম। ব্যস্ততা এবং নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে রাত পর্যন্তও এফবিতে ঢুকিনি। এর মধ্যে সহপাঠী মাজিদ ভাই ফোনে বিস্তারিত বললে তার সাথে মৌখিকভাবে আল্লামা মামুনুল হক সাহেবের সংশ্লিষ্টতা না থাকার বিষয়টি বলি এবং রাতেই খোলাসা করার ব্যাপারে ইচ্ছাপোষণ করি। কিন্তু সে রাতে ব্যস্ততা সেরে ফেসবুকে আসতে অনেক বিলম্ব হয় এবং এসে দেখি আমার সুপ্রসিদ্ধ ওস্তাদ এবং সহপাঠী আমার বরাত দিয়ে বিষয়টি ওজাহাত করেছেন। তাতে আমি আশ্বস্ত হই এবং দায়মুক্তি অনুভব করি। পরদিন দীর্ঘ জার্নি করে ঢাকায় ফিরি এবং সংগঠনের পূর্ব নির্ধারিত কাজে গত দুদিন প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকি। কিন্তু এর মধ্যে বড় ভগ্নিপতি Mufti Aziz Ullah দা. বা. ও অন্যান্য সহপাঠীরাসহ অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীরা জানান যে, আমার পক্ষ থেকে বিষয়টির খোলাসা না হওয়ায় ধূম্রজাল তৈরি করে পরিবেশ ঘোলাটে করতে একটি মহল সচেষ্ট। তারা দুই পক্ষের বিবাদকে উস্কে দিতে আমার পাঠ্য জীবন নিয়েও মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে।

চার. আমি যে কারণে বেশি বিব্রত বোধ করেছি এবং কষ্ট পেয়েছি তা হলো, ঘটনার পর থেকে বিগত সাত বছরেও জামিয়া রাহমানিয়া ও আমার সেখানকার আসাতিযায়ে কিরামকে নিয়ে আমি অফিসিয়াল-আনঅফিসিয়াল বা ঘরে-বাইরে কখনো কোথাও টু শব্দটিও করিনি। কারণ আমি ব্যক্তির চেয়েও প্রতিষ্ঠান বা তদসংশ্লিষ্টদের সম্মানের জায়গাটাকে সবসময় বড় করে দেখেছি। তাই এখন আমি যদি খোলাসা করতে যাই, তাহলে আল্লামা মামুনুল হক সাহেব হুজুরের সংশ্লিষ্টতা না থাকার বিষয়টি যেমন বলতে হয়, পাশাপাশি বহিষ্কার ও বেত্রাঘাতের বিষয়গুলোও পরিস্কার করতে হয়, যা আমার কাছে ভালো লাগেনি। তারপরও উভয় পক্ষের অগ্রহণযোগ্য আচরণের ফলে বিষয়টি খোলাসা করতে হলো।

পাঁচ. ভাইরাল পোস্টের বর্ণনায় আল্লামা মামুনুল হক সাহেবের সংশ্লিষ্টতা ও পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করা সত্ত্বেও ছেড়ে না দেয়ার ব্যাপারটি পুরোপুরি মিথ্যা হলেও বহিষ্কার ও বেত্রাঘাতের ঘটনাটি সত্য এবং তা কেবল মাত্র সংগঠন করার অপরাধেই করা হয়েছে। এ মর্মে সিদ্ধান্তটি জানিয়েছিলেন আল্লামা মাহফুজুল হক সাহেব হুজুর দা. বা. (জামিয়ার প্রিন্সিপাল)। আর বেত্রাঘাত করেছেন মাওলানা হাসান সাহেব হুজুর। (নাজেমে দারুল ইকামা)
বহিস্কারের দিন সকালে মাহফুজ সাহেব হুজুর আমাকে দোতলায় (প্রিন্সিপাল কক্ষ) ডেকে পাঠিয়েছেন। সাথে আমাদের সহপাঠী মাজিদ ভাইকেও। সেখানে জামিয়ার আরও কয়েকজন আসাতিযাও ছিলেন। হুজুর বলেছেন, “দ্যাখো! তোমাদের মাসলাকেরও তো ঢাকাতে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, তাই না?” “আমরা মনে করতেছি তোমার এখানে থাকাটা তোমার জন্যও পেরেশানির কারণ আমাদের জন্যও পেরেশানির কারণ। এজন্য আমরা চাচ্ছি, তুমি তোমাদের মাসলাকের কোন একটা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বাকি পড়াশোনাটা শেষ করো।” তারপর হুজুর বলেছিলেন, “আমরা কি বিষয়টা তোমাকে বুঝাইতে পারছি?” আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে হুজুরদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে এসেছি।

ছয়. আমাদের সহপাঠী মাজিদুর রহমান ভাই লাইভে অন্য যে কারণটি উল্লেখ করেছেন, সে অভিযোগটি কেন আমার নামে আরোপ করা হয়েছে; বিষয়টি মাজিদ ভাইসহ অন্যান্যরা ভালোই জানেন। অবশ্য মাজিদ ভাই নিজেও একাধিকবার সেই মুরুব্বি ওস্তাদের দরস থেকে ওঠার কথা বলেছেন। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ছিলোনা। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক (!) তা অভিযোগ আকারে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে বিষয়টিকে আমাদের কিছু বন্ধু ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে আমার শিক্ষাজীবনকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছেন। যা নিঃসন্দেহে মাজলুমের ওপর দ্বিতীয়বার জুলুমের শামিল।

সাত. জামিয়ায় শরহে বেকায়া, জালালাইন ও মেশকাত পর্যন্ত পড়েছি। আসাতিযায়ে কিরামের দোআ, মোহাব্বত ও ভালোবাসাই পেয়েছি বেশি। মাদরাসা বা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার মতো কোন আচরণ করিনি। ছাত্র কাফেলার দেয়ালিকায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। মুফতি হিফজুর রহমান সাহেব হুজুর ও নোমান সাহেব হুজুরের (রহ.) বই-কিতাব লেখা ও বিভিন্ন স্থানে পৌছানোর কাজে খেদমত করার সুযোগ পেয়েছি। আশরাফুজ্জামান সাহেব হুজুরের স্নেহ মমতা পেয়েছি। নুরুজ্জামান সাহেব হুজুর কম্পিউটারের বেসিক শেখার সময় কিছুটা সময় দিতে পেরেছি। মরহুম আশরাফ আলী সাহেব হুজুরের ব্যক্তিগত খেদমত করার তাওফিক হয়েছে। মুফতি আমীনুল ইসলাম সাহেব মাকামাতে হারীরি পড়াতেন। আমি খাতায় যে নোট করতাম, হুজুর সেটা খুব পছন্দ করতেন এবং বছরের শেষে হুজুরের নির্দেশে পুরো খাতা ফটোকপি করে হুজুরের হাতে দিতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। এভাবে পুরো সময়টাতে সবার দোআ নেয়ার চেষ্টা ছিলো।

তার আগে ফেনীর দারুল উলুম মহিউসসুন্নাহ’য় নূরানী-মক্তব থেকে হিফজ ও কিতাব বিভাগে শরহে জামি পর্যন্ত (এই পর্যন্তই ছিল তখন) পড়েছি প্রশংসার সাথে। রাহমানিয়াতে তাকমীল ও তাখাসসুস পড়েই ফারিগ হওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তাকদীরের লেখা তো অখণ্ডনীয়। সে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। কিন্তু এসব নিয়ে কোনদিন কোন দুঃখ ক্ষোভ করিনি।

পরিশেষে, সকল ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং আমার কারণে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন; তাদের কাছেও ক্ষমা চাই। সেইসাথে বলতে চাই, আমাকে জড়িয়ে যে লোকটি পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে মামুন সাহেব হুজুরের ওপর মিথ্যারোপ করে এমন অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিয়েছে এবং যারা না বুঝে একটি ফেইক আইডির দেয়া অনির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে ফেসবুকের পাতা ভারি করে ফেলেছেন, তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালাই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক।

-নূরুল করীম আকরাম
কেন্দ্রীয় সভাপতি
ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

  • 299
    Shares